
সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করার আশ্বাস এসআরবি-১৪ অধিনায়কের
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ২২:১২

জাতীয় সংসদের এলডি হলে মডেল ইউনাইটেড নেশনস ২০২৬ এ কথা বলছেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল
জাতীয় সংসদের এলডি হলে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) শুরু হয়েছে ২ দিনব্যাপী বাংলাদেশ ইয়ুথ মডেল ইউনাইটেড নেশনস ২০২৬।ফিউচার বাংলাদেশ আয়োজিত এ সম্মেলনই জাতীয় সংসদের এলডি হলে অনুষ্ঠিত প্রথম মডেল ইউএন।
২ দিন ধরে তরুণ প্রতিনিধিরা জাতিসংঘ ও জাতীয় সংসদের আদলে গড়া কমিটিগুলোতে নীতি নিয়ে বিতর্ক করবেন, প্রস্তাব তৈরি করবেন এবং ভোটে সিদ্ধান্ত নেবেন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
অনুষ্ঠানে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আবদুল আউয়াল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড এবং সম্মেলনের মহাপরিচালক মো. আসিফুজ্জামান।
পরে সম্মেলনের মহাসচিব আবদুল্লাহ আল মোক্তাদির রায়হান আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল তরুণ প্রতিনিধিদের বলেন, বিতর্কে মতভেদ থাকবেই, তবু প্রত্যেকের কথা মন দিয়ে শুনতে হবে।
সংসদকে সবার মতামত শোনার জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, পাল্টা যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিটি কণ্ঠ শুনতে হবে। আজ ও আগামীকালের আয়োজনে আপনারা অবশ্যই তর্ক-বিতর্কে যাবেন, কিন্তু কারও কথাই উপেক্ষা করবেন না।”
জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক ধারায় বাংলাদেশ আর ফিরে যেতে চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তরুণদের মেধা ও দক্ষতা থেকে আগামী প্রজন্ম কীভাবে উপকৃত হবে, সেটাই দেখতে চাই।
তার ভাষায়, “আপনার যে মেধা আছে, যে ভাবনা আছে, তা যখন ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে ভাগ করে নেবেন, তখনই আমরা আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে পাব।”
দেশ গড়ায় তরুণদের নেতৃত্বের কথা তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, সেই নেতৃত্বের জন্য দরকার সঠিক শিক্ষা, দক্ষতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে রক্ষা করতে হবে। আইনের শাসন ও মানবাধিকারভিত্তিক সমাজ গড়তে হবে।
প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এটাই আপনাদের সময়। নিজের দেশ গড়ার, নিজের বাংলাদেশ গড়ার, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার।”
উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চাওয়া তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আপনাদের অনেকে হয়তো উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবেন। আপনাদের ও আপনাদের অভিভাবকদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ, দয়া করে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন।”
অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে মডেল ইউএন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেরা তরুণদের সরকারি অর্থায়নে জাতিসংঘ সদর দফতরে পাঠানোর আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব এলে আগামী বছর থেকে এ উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
মাহদী আমিন জানান, আয়োজকেরা তাকে আমন্ত্রণ জানাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গেলে তিনি একটি দেশব্যাপী প্রতিযোগিতার প্রস্তাব দেন। যেখানে প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নেবে।
চ্যাম্পিয়নদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা তাদেরকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে পাঠাতে চাই।”
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের বারুক কলেজে পড়ার সময় তিনি নিজেও মডেল ইউনাইটেড নেশনসে অংশ নিয়েছেন এবং কলেজের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘ সদর দফতরে গিয়েছিলেন।
তরুণদের দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ ও প্রত্যাশা নীতিনির্ধারণে শুনতে ও যুক্ত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর নীতি তৈরিতেও তরুণদের মত নেওয়ার কথা তুলে মাহদী আমিন বলেন, “আমরা যারা নীতিনির্ধারণে রয়েছি, আমরা শুধু বলব না, আমরা শুনব।”
শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে আরও বেশি অংশ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, জীবনে সফল হতে বা ভালো কিছু করতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল করার প্রয়োজন নেই। প্রতিনিধিদের অনেকেই সামনের দিনে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবেন উল্লেখ করে তিনি তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
মডেল ইউএনের মধ্য দিয়ে তরুণেরা নিজের দেশের প্রতি অঙ্গীকারের পাশাপাশি বিশ্বনাগরিকত্বও তুলে ধরতে পারেন বলে মন্তব্য করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. ডেভিড ডাউল্যান্ড।
ড. ডাউল্যান্ড বলেন, এই মডেল ইউএন উদ্যোগে শুভকামনা জানাতে আসতে পারা তার জন্য সম্মানের।
বাংলাদেশি তরুণদের দেশপ্রেম দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন জানিয়ে বলেন, ঢাকায় তরুণদের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল জাতীয় সংগীত দিয়ে, যা অনেক দেশেই দেখা যায় না।
তিনি বলেন, প্রতিনিধিরা যে প্রশ্ন নিয়েই আলোচনা করুন, সবকিছুর মূলে একটি মৌলিক প্রশ্ন: কীভাবে একটি শক্তিশালী, মানবিক, প্রজ্ঞাবান, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সভ্য ও সৃজনশীল সমাজ গড়ে তোলা যায়।
তিনি আরও বলেন, সমাজ ভঙ্গুর; একে টিকিয়ে রাখতে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অঙ্গীকার প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সুবিধা আনলেও ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকিও তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল আউয়াল বলেছেন, বর্তমান সরকারের নীতি জনগণকেন্দ্রিক। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
আব্দুল আউয়াল বলেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আলাদা। বিএনপি সব সময় জনগণের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে রাজনীতি করে আসছে।
তিনি বলেন, আমাদের সরকারের নীতি জনগণকেন্দ্রিক। এ প্রসঙ্গে তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ ও উদ্যোক্তা তৈরির কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব কর্মসূচি সরকারের জনকল্যাণমূলক নীতির প্রতিফলন এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
আব্দুল আউয়াল বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ৭৩ শতাংশ অঙ্গীকার সরাসরি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকি অঙ্গীকারগুলোও পরোক্ষভাবে এসডিজির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি বলেন, এভাবেই সরকার তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তরুণদের সরকারের নীতি এবং বিএনপি কীভাবে জনগণের জন্য কাজ করে, তা বোঝার আহ্বান জানান তিনি।
একইসঙ্গে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নীতি ও কর্মসূচি সম্পর্কে জানার পরামর্শ দেন।
উদ্বোধন ঘোষণার আগে সম্মেলনের মহাসচিব আবদুল্লাহ আল মোক্তাদির রায়হান প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বলেন, “আজ আপনারা সম্মানিত নেতৃবৃন্দ ও নীতিনির্ধারকদের কথা শুনেছেন। কিন্তু এই হলের দিকে তাকিয়ে বলতে পারি, আপনারা, প্রতিনিধিরাই এই সম্মেলনের প্রাণ, আপনারাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।”
দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রতিনিধিদের ‘ওয়েলকাম হোম’ বলে স্বাগত জানান তিনি। প্রতিপাদ্য বেছে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মহাসচিব বলেন, “এবারের থিম আমরা শুধু কাগজে-কলমে জমকালো শোনায় বলে বেছে নিইনি; বেছে নিয়েছি, কারণ এটাই আমাদের সবার বাস্তবতা।”
তিনি বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি যখন কৃষি ও প্রযুক্তির সঙ্গে মেলে, তখনই গড়ে ওঠে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ; আর সেই সম্ভাবনার আসল শক্তি তরুণদের কৌতূহল ও কঠিন সমস্যা সমাধানের আগ্রহে।
এই দুই দিন বিতর্ক করতে, দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়তে এবং তরুণ বাংলাদেশি নেতারা কী করতে পারেন তা দেখিয়ে দিতে প্রতিনিধিদের আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনের মহাপরিচালক মো. আসিফুজ্জামান বলেন, “জাতীয় সংসদের এই ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমরা ৫ কোটি তরুণকে কেবল আগামীর ভবিষ্যৎ হিসেবে ঘোষণা করছি না; আমরা সেই ৫ কোটি তরুণের পাশে দাঁড়িয়ে বলছি, তারা আমাদের বর্তমানকে পুনর্নির্মাণ করছে।”
প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা এখানে একে অপরকে যুক্তিতে হারানোর জন্য আসিনি; আমরা এসেছি বিভক্ত পৃথিবীকে এক করার মহৎ চিন্তায় একতাবদ্ধ হতে।”
আয়োজক প্রতিষ্ঠান ফিউচার বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক রেদোয়ান আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণেরা। কিন্তু নেতৃত্ব বক্তৃতায় তৈরি হয় না, তৈরি হয় দায়িত্ব নেওয়ার অনুশীলনে। বিওয়াইএমইউএন ২০২৬ সেই অনুশীলনের জায়গা, যেখানে একজন তরুণ শিখবে কীভাবে শুনতে হয়, যুক্তি দিতে হয় এবং সবাইকে নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।”
‘নীতি ও তারুণ্যের সংযোগ’ এই স্লোগানে আয়োজিত এ সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য: ‘শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে তারুণ্যের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কৃষি উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়ন’।
দেশের সব বিভাগের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা প্রতিনিধিরা ছয়টি কমিটিতে অংশ নিচ্ছেন: ফ্ল্যাগশিপ কমিটি জাতীয় সংসদ, এফএও, ইউএনডিপি, ইকোসক, ইউনিসেফ ও ইন্টারন্যাশনাল প্রেস।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শেষ হবে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সম্মেলনের সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান মহাসচিব। এই আয়োজনের প্ল্যাটিনাম স্পন্সর এসএসএল, মিডিয়া পার্টনার সময় টিভি, ডিজিটাল মিডিয়া পার্টনার দ্য ফ্রন্ট পেজ, প্রিন্ট মিডিয়া পার্টনার দৈনিক যুগান্তর এবং হসপিটালিটি পার্টনার কায়া ঢাকা।