
দেশের স্বার্থে কোনো ছাড় নয়: টুকু
জহিরুল হক বাবু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:১৪

মো. সাগর (২৪)। ছবি: সংগৃহীত
পরিবারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার তরুণ মো. সাগর (২৪)। সেখানে একটি বেকারিতে কাজ করতেন তিনি। মাসে আয় করতেন প্রায় ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু বেশি উপার্জনের আশায় এক বাংলাদেশি দালালের প্রলোভনে যোগ দেন রুশ সেনাবাহিনীতে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে প্রাণ হারান তিনি। তবে মৃত্যুর চার-পাঁচ মাস পর সাগরের এক সহযোদ্ধার ফোন আসে, সেখান থেকে জানানো হয়, ‘সাগর আর নেই’। এভাবে সাগরের মৃত্যুর খবর পেয়েছে পরিবার। এখন সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় দিন কাটছে স্বজনদের।
নিহত সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করতে একসময় বাবার সবজি ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন। কখনো চালাতেন রিকশাভ্যান। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর। সেখানে একটি বেকারিতে কাজ করার সময় পরিচয় হয় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে। ওই দালাল তাকে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে বেশি অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখান। পরিবারের পক্ষ থেকে নিষেধ করা হলেও শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের মে মাসে যুদ্ধে অংশ নিতে যান সাগর।
এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ চার-পাঁচ মাস ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছিল স্বজনদের। অবশেষে গত শনিবার এক সহযোদ্ধার ফোনে সাগরের মৃত্যুর খবর পান তারা। তবে কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পরিবারের কাছে নেই।
সাগরের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পরিবারে। অসুস্থ বাবা-মা ছেলের মৃত্যু সংবাদে ভেঙে পড়েছেন। ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। আশা ছিল, ছেলে উপার্জন করে পরিবারের অভাব দূর করবেন, ফিরিয়ে আনবেন সচ্ছলতা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে গভীর শোকে।
নিহত সাগরের বাবা কবির হোসেন ও মা দেলোয়ারা বেগম ছেলের মৃত্যুর খবরে দিশেহারা। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিয়ে সাগরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে।
কীভাবে সাগর রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন, কোন বাংলাদেশি দালালের মাধ্যমে যুদ্ধে গেলেন এবং তার মৃত্যুর বিষয়টি কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা বলে জানালেন সাগরের বাবা কবির হোসেন। একই সঙ্গে ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তারা স্পষ্ট কোনো তথ্য পাননি বলে জানান তিনি।
সাগরের চাচা আবদুল আওয়াল বলেন, ‘সাগর যখন রাশিয়ার বেকারিতে চাকরি ছেড়ে রুশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কথা আমাকে জানায়, তখন আমি তাকে বারণ করেছিলাম। কারণ, সাগর লেখাপড়াই জানে না, সে বিদেশে সেনাবাহিনীতে চাকরি করবে কীভাবে? ওই দেশে অবস্থান করা এক বাংলাদেশি দালাল তাকে ভুল তথ্য দিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে যুক্ত করেছে।’
এ বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হলে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে।