
গুলুস্তান প্রাসাদের নৈশভোজে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
মহানগর ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১:২৯

বুধবার (১৪ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মোহা. আসাদুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত
নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির লোভে সঞ্চয় আর ঋণের প্রায় ১০ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন দালালের হাতে। গন্তব্য ছিল দূর দেশ রাশিয়া। কিন্তু মস্কো বিমানবন্দরে পা রাখতেই সেই রঙিন স্বপ্ন মুহূর্তে বদলে গেল এক নৃশংস দুঃস্বপ্নে। কেড়ে নেয়া হলো পাসপোর্ট ও মুঠোফোন, তুলে দেয়া হলো সেনাবাহিনীর হাতে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক মহড়া শেষে কোনো ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি বা কৌশল ছাড়াই সোজা ঠেলে দেয়া হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অতল গর্ভে–শত্রুপক্ষের ড্রোন ও কামানের গোলা চেনার এক একটি তাজা ‘হিউম্যান টোপ’ বা মানব-শিকার হিসেবে!
আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের ভয়াবহ এই প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২০ জন নিরপরাধ বাংলাদেশি। নবগঠিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি)-এর প্রাথমিক অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে এই শিউরে ওঠার মতো রোমহর্ষক তথ্য।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ব্যাটালিয়নের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-১০-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ–এই তিন পাচারকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণকাজের কথা বলে পাঠালেও সেখানে পৌঁছানো মাত্রই তাদের আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেয়া হয়।
ডিআইজি আসাদুজ্জামান বলেন, “যাদের বাংলাদেশ থেকে নেয়া হয়েছে, তারা কেউ যুদ্ধ করার যোগ্য ছিলেন না। শারীরিক বা কৌশলগত–কোনো ধরনের প্রস্তুতিই তাদের ছিল না। আমাদের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, প্রতিপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করতে এদের একধরনের শিকার বা ‘টোপ’ হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রথম সারিতে পাঠানো হতো। ইউক্রেনীয় বাহিনী যখন তাদের ওপর ড্রোন হামলা চালাত, তখন সেই ড্রোনের গতিপথ ও উৎস দেখে শত্রুর অবস্থান চিহ্নিত করত রুশ বাহিনী।”
এসআরবি জানায়, যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি ঘটনাস্থলে নিহত হন। পরে বিভিন্ন সময় আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকিদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফিরেছেন, দুজন চিকিৎসাধীন মস্কোর হাসপাতালে এবং বাকি ছয়জন এখনও যুদ্ধক্ষেত্রের অজানা স্থানে আটকা পড়ে আছেন।
মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে আসা আহত যুবক রাজনের বরাতে এই কর্মকর্তা জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের স্প্লিন্টারে তার কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। ওই অবস্থাতেই জীবনের শেষ শক্তিতে বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার কাদা ও বরফের পথ হামাগুড়ি দিয়ে তিনি ক্যাম্পে পৌঁছান।
এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের অন্যতম মূল হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) ও তার সহযোগী আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে এরইমধ্যে গ্রেফতার করেছে এসআরবি। ঘটনার সঙ্গে রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারী প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, ফরিদপুর ও গাজীপুরের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। স্বজনরা এখন প্রিয়জনের মরদেহটি অন্তত শেষবারের মতো দেখার আকুল আকুতি জানাচ্ছেন, কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। বিদেশে চাকরির নামে অর্থ লেনদেনের আগে এজেন্সির বৈধতা যাচাই করতে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।