
যেখানে চিকিৎসক দরকার সেখানেই পোস্টিং হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
আলী আকবর টুটুল, বাগেরহাট
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৯

ঐতিহ্যবাহী ষাটগম্বুজ মসজিদ কমপ্লেক্স। ছবি: সময় সংবাদ
দেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যের দুটিই বাগেরহাটে অবস্থিত। একটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, অপরটি মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন ষাটগম্বুজ মসজিদ। এই মসজিদটি ঘিরে আরও রয়েছে ১৭টি নিদর্শন।
অনন্য উচ্চতায় ষাটগম্বুজ মসজিদসহ বেশ কিছু প্রাচীন মসজিদ থাকায় ১৯৮৫ সালে ঐতিহাসিক ‘মসজিদের শহর’ হিসেবে এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত করে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো।
জনশ্রুতি আছে, ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকে সম্রাট ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসনামলে সুদূর দিল্লির জৌনপুর থেকে ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে এই অঞ্চলে আগমন করেন মহান সাধক হজরত খানজাহান (রহ.)।
ইসলাম ধর্মের প্রচারক ও সেনাপতি হজরত খানজাহান (রহ.) ৫৭৩ বছর পূর্বে খলিফাতাবাদ (বর্তমান বাগেরহাট) রাজ্যের রাজধানীতে এটি নির্মাণ করেন। ঐতিহাসিক গবেষক ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে, ১১৪০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত আজকের এই মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণে সময় লেগেছিল ১০ থেকে ১২ বছর।
জনশ্রুতি আছে যে, হজরত খানজাহান (রহ.) ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণের জন্য সমুদয় পাথর সুদূর চট্টগ্রাম আবার কারও মতে ভারতের উড়িষ্যার রাজমহল থেকে অলৌকিক ক্ষমতাবলে জলপথে ভাসিয়ে এনেছিলেন। পুরো মসজিদ তৈরির মূল উপাদান চুন, সুরকি, কালো পাথর ও ছোট ইট। এই মসজিদের স্থাপত্যকলার সঙ্গে মধ্য এশিয়ার তুঘলক (তুরস্ক) স্থাপত্যশৈলীর মিল রয়েছে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
ষাটগম্বুজ মসজিদের নামকরণের সঠিক ইতিহাস নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে, সংস্কৃত শব্দ ‘সাত’ ও ফারসি শব্দ ‘ছাদ’-এর ওপর গম্বুজ থাকায় এটি ‘ছাদগম্বুজ’ থেকে ‘ষাটগম্বুজ’ হয়েছে। আবার কারও মতে, মসজিদের অভ্যন্তরে ছয়টি সারিতে ১০টি করে মোট ষাটটি পাথরের খাম্বার ওপর মসজিদের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে বলে এর নাম হয়েছে ষাটগম্বুজ। কারও মতে, মসজিদটির ছাদ সমতল নয়। এটি গম্বুজ আকৃতির। সেই থেকে মসজিদটি ‘ছাদগম্বুজ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। পরে কথ্যরূপে ‘ষাটগম্বুজ’ নাম হয়েছে। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই এটি কে, কখন নির্মাণ করেছিলেন সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভেতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। দেয়ালগুলো প্রায় সাড়ে ৮ ফুট পুরু। ষাটগম্বুজ মসজিদে গম্বুজের সংখ্যা মোট ৮১টি, সাত লাইনে ১১টি করে ৭৭টি এবং চার কোনায় ৪টি মোট ৮১টি। দক্ষিণ-পূর্ব কোনের বুরুজটির ভেতর দিয়ে ওপরে বা ছাদে ওঠার সিঁড়ি আছে। এর নাম ‘রওশন কোঠা’। আর উত্তর-পূর্ব কোনের বুরুজটি দিয়েও ওপরে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। এর নাম ‘আন্ধার কোঠা’ নামে পরিচিত।
ষাটগম্বুজ মসজিদে দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নামাজ পড়ার সুযোগ রয়েছে। ফজর থেকে এশা পর্যন্ত নামাজের সময় প্রবেশের জন্য কোনো ফি প্রদান করতে হয় না। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তালিকাভুক্ত পুরাকীর্তি হওয়ায় নির্দিষ্ট সময় ও ফি পরিশোধ করে এই মসজিদ ভ্রমণ করতে হয়। ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেন ষাটগম্বুজ মসজিদ চত্বরে। দেশি পর্যটকদের জন্য ফি ৩০ টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ টাকা, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫০০ টাকা। তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ২০০ টাকা।
একই ফিতে প্রবেশ করে মসজিদ কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে থাকা জাদুঘর পরিদর্শনের সুযোগ রয়েছে দর্শনার্থীদের। তবে জাদুঘরে প্রবেশের সময়সীমা ভিন্ন। গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারেন জাদুঘরে। তবে দুপুর ১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত জাদুঘর বন্ধ রাখা হয়। সপ্তাহে রোববার সারা দিন বন্ধ থাকে জাদুঘর।
দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পবিত্র ঈদের জামাত ষাটগম্বুজ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ষাটগম্বুজ মসজিদে পবিত্র ঈদের প্রধান জামাতে দেশ-বিদেশের প্রায় অর্ধলক্ষ মুসল্লি অংশ নেন।
ঢাকা থেকে আসা রাবিব নামের এক দর্শনার্থী বলেন, ‘পরিবারসহ ঘুরতে এসেছি ষাটগম্বুজ মসজিদে। অনেক দিন আগে থেকেই ইচ্ছা ছিল, আজ পূর্ণ হলো। মসজিদের ভেতর ঢুকলেই অন্য রকম প্রশান্তি পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ঐতিহ্যগুলো দেখলে মন ভরে যায়। নারীদেরও নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। চারদিকের পরিবেশ সত্যিই অসাধারণ।’
ঝালকাঠি থেকে আসা অপর দর্শনার্থী হিমায়ল বলেন, ‘ঐতিহ্যের লীলাভূমি বাগেরহাটে ষাটগম্বুজ মসজিদে আমি আগেও এসেছি, যতবার আসি এখানে শুধুই আসতে মন চায়। আগের চেয়ে পরিবেশ অনেক ভালো হয়েছে। চারদিকের পরিবেশ খুব সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর। পবিত্রতা রক্ষায় মাইকিং করা হচ্ছে। এছাড়া ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করছে।’
ষাটগম্বুজ মসজিদের ভারপ্রাপ্ত ইমাম মাওলানা মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘৮১ গম্বুজ, ৬০ পিলার, ১০ মিনার ও চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি রড ছাড়া এই মসজিদ। আনুমানিক ৬০০ বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন হজরত খানজাহান (রহ.)। এই মসজিদে জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়ে থাকে। একসঙ্গে মসজিদের ভেতর দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। পবিত্র রমজান মাসে এই মসজিদে দুই খতম তারাবি অনুষ্ঠিত হয় এবং ইফতারও হয়ে থাকে। দুই ঈদে বাগেরহাট জেলার প্রধান জামাত এখানে অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে হাজার হাজার মুসল্লি সেখানে নামাজ আদায় করেন।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ বাগেরহাট জোনের পুলিশ পরিদর্শক তারেক ফয়সাল ইবনে আজিজ বলেন, ‘সকল দর্শনার্থীর নিরাপত্তা ও মসজিদের পবিত্রতা রক্ষায় ট্যুরিস্ট পুলিশ বাগেরহাট জোন সকাল ৯টা থেকে দুই শিফটে ডিউটি করে থাকে। মাগরিবের নামাজ শেষে যারা ভেতরে থাকেন তাদের বেরিয়ে যাওয়ার জন্য মাইকিং করে অনুরোধ করা হয়।’
বাগেরহাট জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মো. জায়েদ বলেন, ‘ষাটগম্বুজ মসজিদকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা রয়েছে। এই শিল্পকে বিকশিত করতে সরকারিভাবে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের আগমনে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।’