
কুমিল্লায় জামায়াতের দুইপক্ষে সংঘর্ষ, মহানগর সেক্রেটারির গাড়ি ভাঙচুর
ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১:২

ফরিদপুরের মাফিয়াচক্রের বিরুদ্ধে মানববন্ধনে লিবিয়া-ফেরত মিজানুরের আহাজারি | ছবি: প্রতিনিধি
‘ও ভাই, কোন জায়গা গেলে বিচার পাব? এই মাফিয়ারা আমারে নিঃস্ব করে ফেলছে। এর বিচার করবে কারা?’
ফরিদপুরে সক্রিয় লিবিয়া মাফিয়াচক্রের বিচারের দাবিতে মানববন্ধনের সামনে সড়কে গড়াগড়ি করে এভাবেই পাগলের মতো আর্তনাদ করছিলেন নগরকান্দা উপজেলার ফুলসূতি গ্রামের মিজানুর রহমান (৪০)।
মিজানুরকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। ৩ দফায় মুক্তিপণের নামে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় মাফিয়াচক্র। তারপরও মুক্তি মেলেনি।
ভয়াবহ নির্যাতন সইতে না পেরে, জানালা ভেঙে পালিয়ে লিবিয়া পুলিশের শরণাপন্ন হন মিজানুর। তার মতো আরও অন্তত ১১ জন পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মাধ্যমে দেশে ফিরেছেন।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে ডিসি অফিসের সামনে মানববন্ধনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে। একইসঙ্গে, মাফিয়াচক্রের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার ও তাদেরকে দেওয়া টাকা উদ্ধারের দাবিও জানানো হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে ফরিদপুরের অন্তত ১৫টি পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মাফিয়াচক্র। মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় হত্যা করা হয় একজনকে। এছাড়াও, এই চক্রের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার কথা বলে কয়েকজন সাড়ে ৩ বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন।
তাদের দাবি, এই চক্রের মূলহোতা নগরকান্দার কৃষ্ণনগর গ্রামের মুরাদ বেপারী (৪০)। সহযোগী হিসেবে রয়েছেন তার স্ত্রী তানিয়া আক্তার (৩৫), বকুল মাতুব্বর (৫০), ভাঙ্গার বাড়ৈইহাট গ্রামের আনোয়ার শেখ (৩৮), মনির মাতুব্বর (৩৪) এবং আসলাম ও শাহিন নামে আরও দুইজন। সহযোগীরাই স্থানীয় যুবকদের ইতালিতে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে, মূলহোতা মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন।
এর আগে, ২০২৩ সালে এই চক্রের ফাঁদে পড়ে ইতালির নামে লিবিয়া নিয়ে বন্দি করা হয় ভাঙ্গার জাঙ্গালপাশা গ্রামের হাবিব মাতুব্বরকে (৪০)।
বিদেশযাত্রার আগেই তার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের ভিডিও পরিবারে পাঠিয়ে ফের নেওয়া হয় ১০ লাখ টাকা। এরপরও মুক্তি মেলেনি। আরও দাবি করা হয় ১০ লাখ টাকা। পরিবার সেই টাকা দিতে ব্যর্থ হলে হাবিবকে হত্যা করা হয়। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তার মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
স্বামী হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধনে আসেন হাবিবের স্ত্রী তাসলিমা বেগম। বর্তমানে ৩ সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, '১০ লাখ টাকা দিতে না পারায় আমার স্বামীরে মুরাদ মাইর্যা ফেলছে। আমার স্বামীর ১ শতাংশ জায়গা ছিল, সেই জমিও বিক্রি করে দিছি। ৩ সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেছি। স্বামী হত্যার বিচার চাই।'
সে সময় নির্যাতনে হাবিবের মৃত্যু দেখে বন্দিঘরের জানালা ভেঙে অন্তত ২৫ জন পালিয়ে যায় বলে, জানান ভুক্তভোগী আজিজুল ইসলাম। তার কাছ থেকে একই চক্র হাতিয়ে নেয় ২৭ লাখ টাকা।
নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে আজিজুল বলেন, ৩ দিন না খাইয়ে রাখার পর এক রাতে প্রচুর মারধরে হাবিব মারা যায়। হাবিবের লাশ নিয়ে ভূ-মধ্যসাগরে ফেলে দিতে যাওয়ার সুযোগে জানালা ভেঙে পালিয়ে এক লিবিয়ানের বাসায় আশ্রয় নিই। ওই ব্যক্তি পুলিশে খবর দেয়। পরবর্তীতে আইওএমের মাধ্যমে দেশে ফিরি।
ওই চক্রের কব্জায় গিয়ে নিখোঁজ আল-আমিনের মা চামেলী বেগম বলেন, আজ তিন বছর যাবৎ ছেলে নিখোঁজ। কী অবস্থায় আছে জানতে পারি নাই। আমি শুধু ছেলেটার সন্ধান চাই। এ ঘটনায় মামলা করলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চক্রের মূলহোতা মুরাদ বেপারীর লিবিয়ার নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল ও খুদেবার্তা পাঠিয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। এছাড়া অন্য সহযোগীরাও গা ঢাকা দিয়েছে।
ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) শামসুল আজম এ প্রসঙ্গে জানান, ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউ মামলা করে থাকলে, তদন্ত সাপেক্ষে পদক্ষেপ নেবে পুলিশ।