
হলুদের ক্ষেতে রক্তাক্ত মরদেহ, পাশে পড়ে ছিল মোটরসাইকেল
সুজাউদ্দিন রুবেল
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৩১

কক্সবাজার শহরের মূল হোটেল-মোটেল জোন থেকে শুরু করে মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও কটেজ।
পাহাড়, সমুদ্র আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর কক্সবাজারে ছুটে আসেন লাখ লাখ পর্যটক। আগত পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা করতে শহরের মূল হোটেল-মোটেল জোন থেকে শুরু করে মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও কটেজ। তবে পর্যটননগরী কক্সবাজারে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রয়ে গেছে চরম অবহেলা ও ঘাটতি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের প্রায় ৫০০টি হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে মাত্র ১০০টির। অর্থাৎ বাকি প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠানই ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে।
সম্প্রতি মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ইনানীর ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মর্মান্তিক প্রাণহানির পর সরকারি বিভিন্ন দফতরের তদারকি ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে জোর প্রশ্ন উঠেছে। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তা কিংবা নোটিশ দেয়ার পরও সময়মতো কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হলে এতগুলো তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে যেত না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জেলার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ফায়ার লাইসেন্স নেয়ার আগ্রহ একেবারেই নগণ্য। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, কক্সবাজারে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৫০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ১০০টি ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছে। আর নতুন চালু হওয়া অনলাইন ই-লাইসেন্সিং ব্যবস্থায় আবেদন করেছে মাত্র ৫২টি প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, ‘প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠান এখনও কোনো ফায়ার লাইসেন্স ছাড়াই অনায়াসে ব্যবসা পরিচালনা করছে, যা অগ্নিনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।’
অন্যদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসায়িক লাভকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে স্থানীয় রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ মালিকরা নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন ও প্রয়োজনীয় বিধিমালা মেনে চলতে চান না। বারবার নোটিশ দেয়া, সতর্ক করা এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করার পরও কোনো স্থায়ী সুফল মিলছে না।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি জানান, প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ব্যয় এড়াতেই মূলত অধিকাংশ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ আইনকানুন মানতে চায় না। তিনি বলেন, ‘তাদের বারবার সতর্ক করা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হলেও বিষয়গুলো তারা মোটেই গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। যখনই আইনগত ব্যবস্থা নিতে যাওয়া হয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নানা অনুনয়-বিনয় শুরু করেন। এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে জরিমানা বা উচ্ছেদ করার দুই মাসের মধ্যে দেখা যায়, আবার সেই একই জায়গায় অবৈধ স্থাপনা তৈরি করে ব্যবসা চালানো হচ্ছে। এই প্রবণতা ঠেকাতে শুধু সতর্ক করা বা সাময়িক জরিমানা করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’
গত শনিবার ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, অনিয়ম ও নিরাপত্তার ঘাটতির বিষয়ে আগে থেকে ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য দফতর অবগত থাকলেও কোনো শক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
নিহত এক পর্যটকের স্বজন নঈমুদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফায়ার সার্ভিসের নোটিশ উপেক্ষা করেও কেবল প্রশাসনিক জরিমানা গুনে রিসোর্টের কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি জরিমানা আদায়েই সীমাবদ্ধ না থেকে কঠোরভাবে রিসোর্টটি বন্ধ করে দিত, তবে এই ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটত না।
নিহতদের আরেক স্বজন ফয়সাল জাহান বলেন, ‘টুপটুপ রিসোর্টের নিচতলায় রেস্তোরাঁ পরিচালনার অনুমতি বা সুযোগ থাকলেও উপরের কাঠের ও দাহ্য কাঠামোর স্থাপনা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট সতর্কতা ছিল। কিন্তু রিসোর্ট মালিকরা সেই সতর্কতা পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন।’ প্রশ্ন তুলে ফয়সাল জাহান আরও বলেন, ‘সতর্ক করার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় আজ যে ১০টি প্রাণ ঝরে গেল, এই ঘটনার দায় আসলে কার? কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা আর অবহেলার দায় সাধারণ পর্যটকেরা কেন নিজের জীবন দিয়ে দেবে? ভবিষ্যতে যেন আর কাউকে এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য অবিলম্বে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
অনুমোদনহীন ও অবৈধ এসব স্থাপনা বন্ধের ক্ষেত্রে নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও। তাদের মতে, অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণ রোধে বিভিন্ন দফতরের মধ্যে কাজের সমন্বয় থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। তবে জনবল সংকট ও ঝটিকা নির্মাণের কারণে অনেক সময় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে দেরি হয়ে যায়।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়ার আগেই সেটি আইনি নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা সঠিকভাবে যাচাই করা জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব দফতরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই রাতারাতি কাঁচা বা দাহ্য পদার্থের স্থাপনা তৈরি হয়ে যায়। বিষয়টি প্রশাসনের গোচরে আসার আগেই নির্মাণকাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। তবে এরইমধ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং সমন্বিতভাবে এসব অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
এদিকে কক্সবাজারকে একটি পরিকল্পিত ও নিরাপদ পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আইন ও বিধিমালার আলোকে আমাদের পরিদর্শকরা নিয়মিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিধিমোতাবেক নোটিশ দেয়া হয়। চূড়ান্ত নোটিশ দেয়ার পরও যারা অবৈধ অংশ অপসারণ করে না, তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে স্থাপনা ভেঙে ফেলার নিয়ম রয়েছে। ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ এলাকার সংশ্লিষ্ট অবৈধ স্থাপনাগুলোকে এরইমধ্যে চূড়ান্ত নোটিশ দেয়া শেষ হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে অন্তত দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে।’
উল্লেখ্য, ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ এরইমধ্যে রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপকসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। তবে প্রতিবার দুর্ঘটনার পরই এমন মামলা আর আশ্বাসের জোয়ার উঠলেও অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করা, অবৈধ অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নিয়মিত নজরদারির অভাব দূর করার মূল জায়গায় কতটা পরিবর্তন আসবে–সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।