
সুনামগঞ্জে মাদক নিয়ে সংবাদ করায় সাংবাদিককে কুপিয়ে জখম
প্রতিবেদক, কক্সবাজার
প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:২৯

নিহত নাসরিন আক্তার মুক্তার স্বামী ফয়সাল জাহান কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে অবস্থান করছেন। ছবি: সময় সংবাদ
কক্সবাজারের ইনানীতে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের মালিক তানভীরসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় রিসোর্টের ম্যানেজার সুমনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মালিকপক্ষের অন্যরা পলাতক। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে ১০ জনের মরদেহ। তবে আগুনে মরদেহগুলো এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো দেখে নিশ্চিতভাবে পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
প্রিয়জনের মরদেহের অপেক্ষায় হাসপাতালের মর্গে ভিড় করছেন স্বজনরা। তাদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে সেখানকার পরিবেশ। স্বজনদের দাবি, দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন করে মরদেহ হস্তান্তর এবং অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
‘আমরা শোক প্রকাশ নয়, জবাবদিহিতা চাই’
ইনানী রিসোর্টের আগুনে নিহত নাসরিন আক্তার মুক্তার মরদেহ বুঝে নিতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে এসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তার স্বামী ফয়সাল জাহান। স্ত্রীর সঙ্গে শেষ ভিডিও কলের স্মৃতি বুকে নিয়ে শোক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তার। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত মরদেহ শনাক্তকরণ, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ফয়সাল জাহান বলেন, ‘আমি জানি, আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু আমি চাই না, আর কোনো স্বামীকে এভাবে তার স্ত্রী হারাতে হোক, আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজতে হাসপাতালে ছুটতে হোক।’
ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি ফয়সাল জাহান রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, কোনো রিসোর্ট প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া পরিচালিত হলে এবং কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে তার দায় কার? তার মতে, যাদের দায়িত্ব ছিল তদারকি করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আইন প্রয়োগ করা, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
বড় ভাই, ভাবি ও দুই শিশুসন্তানকে হারিয়ে শোকাহত নঈমুদ্দিন
অগ্নিকাণ্ডে বড় ভাই, ভাবি ও তাদের দুই শিশুসন্তানকে হারিয়েছেন নঈমুদ্দিন। পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে তিনি শোকে স্তব্ধ। তার অভিযোগ, রিসোর্টে পর্যাপ্ত বহির্গমন পথ ও যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলে হয়তো এতগুলো প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।
নঈমুদ্দিন বলেন, ‘আমার বড় ভাই, তার স্ত্রী এবং তাদের দুই ছোট ছোট সন্তান-সবাইকে হারিয়েছি। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা পুরো পরিবার ভীষণ মর্মাহত।’
তিনি বলেন, আগুন লাগার পর ভবন থেকে বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ থাকলে মানুষ অন্তত নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেত। ভবন নির্মাণে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, কোথায় এটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে বন্ধু নাহিদকে হারিয়ে শোকাহত জুয়েল রানা। তিনি বলেন, ‘আমি নাহিদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু। নাহিদ আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল, ওকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’
জুয়েল রানা বলেন, এই ঘটনায় কেউ দায়ী থাকলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। দায়িত্ব পালনে যাদের অবহেলা ছিল, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। তবে মরদেহ দেখে নিশ্চিতভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নিহত ব্যক্তিদের এক স্বজন জানান, রোববার বেলা ১১টার দিকে ঢাকার মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে পরিবারের চার সদস্য ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। তাদের দাবি, যত দ্রুত সম্ভব নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হোক। স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্তের পর দ্রুত মরদেহ হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হোক।
ওই স্বজন বলেন, ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পরিবারগুলো প্রিয়জনের মরদেহ কিংবা দেহাবশেষের অপেক্ষায় রয়েছে। এই কঠিন সময়ে প্রশাসনের কাছে তাদের প্রত্যাশা, দ্রুততম সময়ে ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া শেষ করে মরদেহ শনাক্ত ও হস্তান্তর নিশ্চিত করা হবে।
পরিচয় শনাক্তে লাগতে পারে তিন থেকে চার সপ্তাহ
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মরদেহ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। মরদেহ দেখে নিশ্চিতভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, প্রথমে মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হবে। পরে পুলিশের মাধ্যমে সেগুলো ঢাকায় সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের প্রথম-স্তরের আত্মীয়দের কাছ থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হবে। পরীক্ষার ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
আরএমও আরও বলেন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ কাজে তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে পরীক্ষার কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
আহত তিনজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে
অগ্নিকাণ্ডে আহত ব্যক্তিদের মধ্যে চিকিৎসক দম্পতিসহ তিনজনকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আরএমও সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল।
তিনি বলেন, চিকিৎসক দম্পতি তুলনামূলকভাবে কম আহত হলেও নিজেদের ইচ্ছায় ঢাকায় যেতে চেয়েছেন। অন্যদিকে মেহেরুন্নিসা নামের এক নারী গুরুতর আহত হওয়ায় তাকে তার স্বামীসহ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
আহত আরও দুজন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাদের আঘাত তুলনামূলকভাবে সামান্য হওয়ায় তারা নিজেদের ইচ্ছায় ছাড়পত্র নিয়ে পরিবারের কাছে ঢাকায় চলে গেছেন। বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডে আহত আর কেউ হাসপাতালে ভর্তি নেই বলে জানান তিনি।
অবহেলার অভিযোগে মামলা, গ্রেফতার রিসোর্ট ম্যানেজার
অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় হোটেল কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে রিসোর্টের মালিক ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে। পুলিশের একজন উপপরিদর্শক (এসআই) বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
তিনি বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে কর্তৃপক্ষের অবহেলার বিষয়টি সামনে এসেছে। যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই প্রতিষ্ঠানটি আবাসিক হোটেল বা রিসোর্ট হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
মামলায় প্রতিষ্ঠানের মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা একজন ম্যানেজারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মালিকপক্ষের অন্যরা পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।