
নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি সই
আব্দুর রশিদ জীবন, রংপুর
প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯

১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের পরও কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় হাসপাতালের ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছে শিশুরা। ছবি: সময় সংবাদ
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে শিশু বিভাগ গঠিত। এ বিভাগের মোট শয্যা ৮৬টি। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী। এছাড়া ১৫০ নার্সের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৫০ জন। গত তিন মাসে হাসপাতালটিতে ১৩২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই মারা গেছে ৫৯ শিশু।
অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে একেকটি শয্যায় তিন-চার শিশুকে রাখতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবায় চাপ বাড়ার পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অথচ এই চাপ কমানোর জন্য রংপুর সদর হাসপাতাল চত্বরে প্রায় সাত বছর আগে ১০০ শয্যার একটি আধুনিক শিশু হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, অন্যান্য জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম না থাকায় এটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
রমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, ‘নির্ধারিত শয্যার তুলনায় শিশু রোগীর চাপ অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি শয্যায় তিন-চারজন বা তারও বেশি রোগী রাখতে হয়। এতে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর চাপ বাড়ে। একইসঙ্গে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে।’
কুড়িগ্রামের রাজারহাট থেকে দুই মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে এসেছেন নারগিস বেগম। জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে তার সন্তান পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। প্রথম দুই দিন মেঝেতে কাটিয়েছে। পরে একটি শয্যায় জায়গা মিললেও সেখানে আরও তিন শিশু রয়েছে। নারগিস বলেন, ‘বাচ্চার জ্বর, শ্বাসকষ্ট। ডাক্তার বলছে নিউমোনিয়া হয়েছে। কিন্তু অসুস্থ বাচ্চা নিয়ে থাকব, সেই জায়গাটুকুও নেই।’
রংপুর নগরীর বাবুখাঁ এলাকার মোসলেমা আখতার সাত দিন ধরে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে আছেন। তিনি বলেন, ‘বাচ্চার শ্বাসকষ্ট, ডাক্তার বলেছে মেডিকেলে ভর্তি করাতে। কিন্তু এখানে ভর্তি করে আরও সমস্যা বেড়ে গেছে। তিনটা ওয়ার্ড মিলে নাকি একটা নেবুলাইজার মেশিন, সিরিয়াল পাওয়া যায় না।’
ঠাকুরগাঁও থেকে আসা স্বপন মিয়া বলেন, ‘আমরা পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছি না। নার্সদের ডাকলে সময়মতো পাওয়া যায় না। জায়গার অভাবে এক বেডে তিন বাচ্চা রাখছি। এমন পরিবেশে বাচ্চার শরীর আরও খারাপ হচ্ছে।’
শিশু বিভাগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের ইনচার্জ নার্স ডলি খাতুন জানান, তার ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৪০টি। অথচ ভর্তি রোগী থাকে প্রায় ১৮০ জন। শীত এলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
শিশু বিভাগের আরেকটি বড় সংকট ফটোথেরাপি নিয়ে। জন্ডিসে আক্রান্ত নবজাতকের চিকিৎসায় এই যন্ত্র প্রয়োজন হলেও রোগীর তুলনায় যন্ত্রের সংখ্যা কম বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।
গাইবান্ধা থেকে নবজাতক সন্তানকে নিয়ে ৩১ দিন ধরে রমেক হাসপাতালে আছেন ইসমাইল হোসেন। তার অভিযোগ, একই ফটোথেরাপি মেশিনে একসঙ্গে দুটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।
জানা গেছে, রমেকের এই চাপ কমাতে নির্মিত ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটিতে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, চিকিৎসকদের কক্ষ, ল্যাব, অপারেশন থিয়েটার, বিশেষায়িত ইউনিট, ওয়ার্ড ও কেবিনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অথচ অধিকাংশ কক্ষই এখনো অব্যবহৃত। বর্তমানে সেখানে শুধু বহির্বিভাগে শিশু রোগী দেখা হচ্ছে, কিন্তু ভর্তি ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জুনে হাসপাতালটির জন্য ৬৫৯ জন জনবল চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। চলতি বছর নার্স ও সাপোর্টিং স্টাফের ১৪৫টি পদ সৃজন হয়েছে। আসবাবপত্রের ব্যবস্থাও হয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের পদ সৃজন হলেই ধাপে ধাপে হাসপাতালটি চালু হবে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ডা. মেশকাতুল আবেদ বলেন, ‘সম্প্রতি ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। হাসপাতালটি ৩ তলা থেকে ৬ তলায় উন্নীত করা হবে। গত মাসে হাসপাতালটিতে তিন গাড়ি আসবাবপত্র এসেছে। ১৪৫টি পদ সৃজন হয়েছে। তবে চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি কবে আসবে, তা আমি জানি না। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।’
এ বিষয়ে ডা. আ ন ম তানভীর চৌধুরী বলেন, ‘রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের বড় একটি জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত। ১০০ শয্যার শিশু হাসপাতালটি প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করে চালু করা গেলে রমেকের ওপর শিশু রোগীর চাপ অনেকটাই কমবে।’